Dr. Al-Amin Sarkar

ডেন্টাল ইমপ্লান্ট: ডেন্টিস্ট্রির একটি বিপ্লব

মানুষের জীবনকে স্বাভাবিক ও সুন্দর রাখতে চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্রতিনিয়ত আধুনিকায়ন ঘটছে।দন্ত চিকিৎসাও পিছিয়ে নেই। ডেন্টাল ইমপ্লান্ট দন্ত চিকিৎসায় নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। দাঁতের আধুনিক চিকিৎসায়, হারানো দাঁত প্রতিস্থাপনে ডেন্টাল ইমপ্লান্ট এখন বেশ নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। সাফল্যের হার প্রায় ৯৬ শতাংশেরও বেশি হওয়ায় দিনে দিনে এর চাহিদা বাড়ছে। দৈনন্দিন জীবনকে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখতে দাঁতকে ভালো রাখতে হবে। তারপরও অবাঞ্চিত নানা কারণে হারাতে হয় এই মহামূল্যবান দাঁত। দাঁত হারালে কৃত্রিম দাঁত সংযোজন জরুরি, তা না হলে উল্লেখিত সমস্যার পাশাপাশি দাঁত ফাঁকা ও এলোমেলো হতে শুরু করে। কৃত্রিম দাঁত হিসেবে খোলাযোগ্য ডেনচার পদ্ধতির জনপ্রিয়তা ছিল অনেক, কিন্তু অপেক্ষাকৃত অনেক কম চিকিৎসা খরচ হলেও এর সঙ্গে বাড়তি প্লেট, তার, প্রতিদিন খোলার ঝামেলা, কথা বলতে জড়তা ইত্যাদি নানা কারণে এর জনপ্রিয়তা এখন নেই বললেই চলে।পরবর্তীকালে ব্রিজ পদ্ধতির জনপ্রিয়তা বাড়ে, কৃত্রিম দাঁতটি পাশের সুস্থ দাঁতকে পিলার হিসেবে কাজে লাগিয়ে শক্তভাবে লেগে থাকে। তবে পাশের সুস্থ দাঁতকে কাজে লাগানোর বিষয়ে অনেকের অনীহা থাকায় বর্তমানে জনপ্রিয়তা বাড়ছে ইমপ্লান্ট পদ্ধতির।

ডেন্টাল ইমপ্লান্টঃ

ডেন্টাল ইমপ্লান্ট হলো টাইটানিয়াম বা টাইটানিয়াম সংকর ধাতুর ছোট স্ক্রু, যা হারানো দাঁত প্রতিস্থাপনে ব্যবহূত হয়। টাইটানিয়াম হলো একমাত্র ধাতু, যা আমাদের দেহ কোনো রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই গ্রহণ করে এবং হাড়কে এর চারপাশে বাড়তে দেয়। শরীরে টাইটানিয়াম অনেক চিকিৎসায় ব্যবহার হয়, যেমন-এর প্লেট ও স্ক্রু ভাঙা হাড় জোড়া দিতে বা শরীরের কৃত্রিম জোড়া সন্ধি বানাতে ইত্যাদি।

স্বাভাবিক দাঁত ও ডেন্টালইমপ্লান্টের সাদৃশ্যঃ

আমাদের দাঁতের দুটো অংশ। একটি রুট বা শেকড়, যা হাড়ের ভেতর থাকে আর অন্যটা ক্রাউন বা মুকুট, যা আমরা দেখতে পাই। দাঁতের শেকড় দাঁতকে হাড়ের সঙ্গে ধরে রাখে এবং শক্ত ও মজবুত রাখে। আর মুকুট অর্থাৎ যাকে আমরা দাঁত বলি তা দিয়ে আমরা খাদ্য চর্বণ ও পেষণ করি। ডেন্টাল ইমপ্লান্টেরও দুটো অংশ। একটা টাইটানিয়াম স্ক্রু, যা হাড়ের মধ্যে বসানো হয় এবং অন্যটা এর ক্রাউন বা দাঁত, যা টাইটানিয়াম স্ক্রুর ওপর বসানো হয়। এই টাইটানিয়াম স্ক্রু হাড়ের মধ্যে বসানো হলে তা হাড়ের সঙ্গে জোড়া লেগে যায় এবং দাঁতের শেকড়ের মতো কাজ করে; যার ওপর পরে কৃত্রিম দাঁত বসানো হয়। দেখা যাচ্ছে, টাইটানিয়াম ইমপ্লান্ট সব দিক থেকেই আমাদের স্বাভাবিক দাঁতের মতো আর এটা কাজও করে স্বাভাবিক দাঁতের মতোই।

ইমপ্লান্টের সুবিধাঃ

ইমপ্লান্ট দেখতে এবং ব্যবহার করতে আসল দাঁতের মতোই। দাঁত যেভাবে মাঢ়ির হাড়ের সঙ্গে শিকড়ের মাধ্যমে লাগানো থাকে, ইমপ্লান্টও একইভাবে বসানো হয়।

অনেকেই ডেনচার (নকল দাঁত) ব্যবহারের কারণে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চারণও যথাযথ হয় না। ইমপ্লান্টে এ ধরনের কোনো অসুবিধা হয় না। বাড়তি দাঁত লাগানো হয়েছে এমন অস্বস্তিও লাগে না।

নকল দাঁত ব্যবহারে অনেকেরই খেতে অসুবিধা হয়। কিন্তু ইমপ্লান্টের ক্ষেত্রে তা হয় না। পাশের দাঁতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না।

ইমপ্লান্ট স্থায়ী পদ্ধতি। তাই বারবার বদলানোর প্রয়োজন হয় না। সাধারণত সারা জীবনই ব্যবহার করা যায়।

মাঢ়ির সুস্থতা এবং চোয়ালের হাড়ের সঠিক পুরুত্ব থাকলে ইমপ্লান্ট সফল হয় বেশি।

কেন ইমপ্ল্যান্ট করাবেনঃ

একটি দাঁত নেই, এর জন্যপাশের আরো ভালো দুটো দাঁতকে কাটাকাটি করাএটা আধুনিক বিজ্ঞান সম্মতি দেয় না। করে। দাঁতেরচিকিৎসা ক্ষেত্রেও এ সমস্যা সমাধানে নতুন পদ্ধতি এসেছে। কাটাকা্টি কম করা যায়ইমপ্ল্যান্ট পদ্ধতিতে। এই জন্য ইমপ্ল্যান্টকে এখন সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়। বিশ্বে ও আমাদের দেশেও এই চিকিৎসা পদ্ধতি শুরু হয়েছে।

প্রাকৃতিক জিনিসের কোনো বিকল্প নেই। ইমপ্লান্ট প্রাকৃতিকের কাছাকাছি হতে পারে। সে জন্য এ পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত দাঁত প্রতিস্থাপনের জন্য।

ইমপ্ল্যান্ট করার জন্য রোগী নির্বাচনঃ

যাঁরা মুখ ও দাঁত ঠিকমতো পরিষ্কার রাখেন না, যাঁদের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও হার্টের অসুখ আছে, কিংবা যাঁরা ক্যান্সারের জন্য রেডিওথেরাপিনিচ্ছেন, যাঁরা চেইন স্মোকার, তাঁদের ইমপ্লান্ট না করাই ভালো। আবার অনেক ক্ষেত্রে রোগী বয়সেরও একটি বিষয় আছে।

প্রক্রিয়াঃ

প্রথমে রোগী নির্বাচন করতে হবে । এরপর জায়গাটিকে নির্বাচন করে লোকাল অ্যানেসথেশিয়া দিয়ে। ড্রিল করা হয়। এরপর ইমপ্ল্যান্টের আকার কী, কত ডায়ামিটারের লাগবে এটা আগে থেকেই দেখা হয়। তার আগে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নেয়া হয়। এরপর সার্জারি।এরমধ্যে একটি হিলিং ক্যাপ লাগানো থাকে, সেটা খুলেদাঁত বসিয়ে দেয়া হয়। এরপর তার ওপর ক্রাউন করে দেয়া হয়, এটা শেষ পর্যন্ত স্বাভাবিক দাঁতের মতোই থাকে।

ইমপ্লান্টের অসুবিধাঃ

এই চিকিৎসা সারা বিশ্বেই অন্যান্য চিকিৎসার তুলনায় ব্যয়বহুল। বাংলাদেশেও এই চিকিৎসা ব্যয়বহুল। তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এটি কম। এটা অত্যন্ত একটি আশাব্যঞ্জক বিষয়।

পরিশেষেঃ

দেশেরইমপ্লান্টআমদানিকারকগণরাও চেষ্টা করছে কীভাবে কম খরচে এই পদ্ধতি জেনারেল ডেন্টিস্টদের মাধ্যমে সাধারণ রোগীর কাছে পৌঁছানো যায়। একমাত্র আক্কেল দাঁত বা মাড়ির সর্বশেষ দাঁতটি ছাড়া যে কোনো দাঁত না থাকলে দ্রুত একজন অনুমোদিত ডেন্টাল চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইমপ্লান্ট লাগানোর মধ্য দিয়ে জীবনকে সুন্দরভাবে উপভোগ করুন।

Leave a Reply